EDITOR
- ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ /

ভয়েস প্রতিবেদক:
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে একটি গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন টানা দুই দিনেও নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে বাপেক্স। নিরাপত্তার কারণে ২২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকায় হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।
উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী ছোটখাল এলাকা। স্থানীয় আব্দুল্লাহ বাড়িতে একটি গভীর নলকূপ খননের কাজ চলছিল। হঠাৎ করেই ভূগর্ভ থেকে বের হতে শুরু করে দাহ্য গ্যাস। মুহূর্তেই সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। এরপর কেটে গেছে দুই দিন। কিন্তু আগুন এখনও জ্বলছে একই তীব্রতায়। আগুন ঘিরে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তা বলয়। দূর থেকে আগুন দেখতে ভিড় করছেন উৎসুক মানুষ। তবে ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসন কাউকে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে যেতে দিচ্ছে না।
আগুনের প্রভাব শুধু ঘটনাস্থলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নিরাপত্তার কারণে জালিয়াপালং ইউনিয়নের প্রায় ২২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে হাজার হাজার পরিবার অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছে। ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতির মুখে পড়েছে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি। বিদ্যুৎ না থাকায় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম, ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীরা।
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য এখলাছ সিকদার, বাড়ীর মালিক আব্দুল্লাহ, মাহমুদুল হক সহ অনেকেই বলছেন, এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা আগে কখনো হননি। দিন-রাত আগুন জ্বলতে থাকায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। আগুন কতদিন চলবে, সেটি নিয়েও মানুষের মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেছেন তারা।
ঘটনার পর থেকেই আগুন নিয়ন্ত্রণে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর বিশেষ বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী দল, পুলিশ, জেলা প্রশাসন এবং বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে। সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি সাধারণ কোনো অগ্নিকাণ্ড নয়। ভূগর্ভ থেকে ক্রমাগত গ্যাস নির্গত হওয়ায় প্রচলিত উপায়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হচ্ছে।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম জানান, ঘটনাস্থল থেকে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। তিনি বলেন, গ্যাসের প্রবাহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না এনে আগুন নিভিয়ে দিলে তা আরও ভয়াবহ বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে। তাই বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ঝুঁকি মূল্যায়ন করেই কাজ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলেও জানান তিনি।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, মানুষের নিরাপত্তাই এখন প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার। সে কারণে ঘটনাস্থলের চারপাশে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। এজন্য এলাকাবাসীকে অযথা ঘটনাস্থলে ভিড় না করার এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভস্থ গ্যাসস্তরে আঘাত লাগার ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতেই থাকবে। তাই তড়িঘড়ি করে আগুন নেভানোর পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। তাদের মতে, আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার আগ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখাই প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ভয়ের/আআ